বাড়ীর পাশে আরশীনগর : চেনা রেঙ্গুন-অচেনা ইয়াংগুন

সিদ্ধান্তটা সাহসীই ছিলো বৈকি, দুই প্রতিবেশী দেশের বৈরিতা আর ঘৃণার বাতাস যখন বেশ প্রবলভাবেই বহমান, সেইসময় সেখানে ভ্রমন করার জন্য সাহসটা লাগেই ! তার উপর আকাশপথের দীর্ঘ ক্লান্তি শেষে যখন স্বস্তির বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাওয়ার কথা, সেই সময় বিমানবন্দরেই সবুজ পাসপোর্টের পাতা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে দ্বিধান্বিত সুন্দরী অফিসারের তার উর্ধতনকে ডেকে আনা এবং হরেক প্রশ্নের ফুলঝুড়ি কিছুটা সংশয় বাড়িয়ে দিলেও শেষাবধি পাসপোর্টের পাতায় পাতায় হরেক দেশের সিলসাপ্পরই হয়তো কপালগুণে পাড় করিয়ে দিয়েছে সীমানাপ্রাচীর ! এরপরের গল্পটা তো ইতিহাসই…….

গন্তব্য অচিনপুর
আমার শৈশব কৈশর তারুণ্যের শহর খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি। পাহাড়ের জল কাদায় বন বাদাড়ে বেড়ে উঠা এই আমি। স্বাভাবিকভাবেই এই জনপদে বসবাস করা প্রাচীন নাগরিকদের সাথে হৃদ্যতা,মুগ্ধতা,ভালোবাসা কিংবা মাখামাখি বেশ। চেহারায় মঙ্গোলিয় ছাপ থাকা এই জনপদের মানুষের সাথে মিল থাকায় প্রতিবেশি মায়ানমারসহ দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার মানুষের প্রতি আমার ছিলো ভিন্নরকম এক টান। ওই জনপদের সংস্তৃতি,জীবনাচরণ,ঐতিহ্য আর ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ দেখার পুরনো টান থেকেই মূলত: ওই জনপদে যাওয়ার প্ল্যান করা। যেই প্ল্যান সেই কাজ। এবারের গন্তব্য তাই মিয়ানমার,ভিয়েতনাম,ফিলিপাইন ও কম্বোডিয়া। শুরুতেই মিয়ানমার। তাই এই কাহিনী মিয়ানমারে শুরু হয়ে আটকে যাবে মিয়ানমারেই।

এইবার তোমার আপন দেশে চলো-
সত্যি বলতে কি মিয়ানমারকে আমার কখনোই অন্যকোন দেশ মনে হয়নি। চট্টগ্রামের সাথে রেঙ্গুনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক,চট্টগ্রামের পুরুষের বার্মিজ নারীর প্রতি প্রেম,ভালোবাসা কিংবা মোহ আর ব্যবসা বাণিজ্যের বৈষয়িক সম্পর্কের নানান পাঠ আমাকে এই দুটি জনপদের মানুষের মধ্যে যে কাঁটাতারের সীমান্ত দেয়াল তাকে আটকে দিতে পারেনি কখনই। তাই চেনা শোনা জানা মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে এক যাযাবরের উড়াল,শুধু ভ্রমনের প্রয়োজনেই নয়, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের পুরনো লেনদেনের হিসেব চুকোতেও !

৫ মে ২০১৯ !
থাই লায়ন এয়ারের একটি ফ্লাইটে রওনা হলাম ব্যাংককের উদ্দেশ্যে। গন্তব্য মিয়ানমার। কি অবাক হচ্ছেন ? কিছুটা অবাক হলেও সত্যি যে,বাংলাদেশ-মিয়ানমার সরাসরি ফ্লাইট সবসময় সহজলভ্য নয়। তাই ব্যাংকক হয়ে যাওয়াটাই স্বস্তির ও সাশ্রয়ী। আমি ব্যাংককের ডন মিয়ং আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে ঘন্টাদুয়েক অপেক্ষা করেই ইয়াঙ্গুন এর ফ্লাইট ধরে পৌঁছে গেলাম ‘কিছুটা ভয়ের,কিছুটা সংশয়ের,খানিকটা দ্বিধা’র শহর ইয়াঙ্গুনে। এয়ারপোর্টে বাংলাদেশী পর্যটক সম্ভবত খুব বেশি পরিচিত চেহারা নয়। ফলে বেশ কিছু প্রশ্নের মুখোমুখিই হতে হলো। অন্যদের স্বল্পতম সময়ে ছেড়ে দেয়া হলেও বাংলাদেশী পাসপোর্টের এই আমি বাড়তি সময় ধরে,নিজের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ও সম্ভাব্য সব গন্তব্যের টিকেট,বুকিং এবং হাতে থাকা ডলারের মজুদ জানিয়ে,কিছুটা আস্থার প্রতিদান দিয়ে পার হতে পারলাম এয়ারপোর্ট। তবে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেয়া হলো, আমি যেনো ইয়াঙ্গুন এর বাইরে দূরের কোন শহরে না যাই ! কি আর করা, আপাতত ভরসা ইয়াঙ্গুনই।
ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ হতেই তো অবাক হওয়ার পালা। চারদিকে সব লুঙ্গিপড়া মানুষজন ! আমাদের চিরচেনা লুঙ্গি যে ওদের জাতীয় পোশাক সেটা জানতাম, তবে সর্বত্র তার এমন আয়েশী ব্যবহার দেখব সেটা অন্তত আশা করিনি। শুরুতেই এয়ারপোর্ট ডেস্ক থেকে আমার বুকিং করা হোটেলের ঠিকানা দেখিয়ে যাওয়ার নির্দেশিকা জানতে চাইলাম। চমৎকার সুশ্রী চেহারার এক নারী কি ভীষণ আন্তরিকতায় জানিয়ে দিলো হোটেলে যাওয়ার পথ। শুধু তাই নয়, তার পরামর্শেই ব্যয়বহুল নিজস্ব গাড়ি না নিয়ে শাটল বাসে করেই চলে গেলাম শ্যোলে প্যাগোডা এলাকায় অবস্থিত আমার ইয়াঙ্গুনের আবাস হোটেল সিটি স্টারে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল অবধি যাওয়ার সময় শোনা মিয়ানমার আর দেখা মিয়ানমার’কে মেলাচ্ছিলাম ! কি অদ্ভূত বৈপরিত্য। কি ছিমছাম সুন্দর চারপাশ। যেনো চট্টগ্রাম কিংবা রাঙামাটি শহর। তবে এদের চেয়েও কয়েকশগুণ পরিচ্ছন্ন। বাস থেকে নেমে এক বার্মিজ তরুনীর সহযোগিতায় হোটেল খুঁজে নিলাম। হোটেলে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম আমার ইয়াঙ্গুনের ভবঘুরে জীবনে ! সেইসব গল্পের সব কিছু কি বলা যাবে ? বলা কি উচিত ? টানা কটা দিনের প্রতিটা মুহুর্ত,প্রতিটা ঘন্টায়-মিনিটে জমা অজ¯্র স্মৃতি,অসংখ্য মানুষ, ইতিউতি ছুটে চলা,গভীর রাত অবধি ড্যান্সফ্লোরে নতুন বন্ধুদের সাথে উচ্ছাসে মেতে থাকা, পায়ে হাঁটা দীর্ঘ পথ-পথের স্মৃতি-পথের রাতজাগা সঙ্গীরা,সেসব আমার নিজস্ব গল্প। যা কারো সাথেই কখনই শেয়ার করিনা আমি। কোন কোন দিন গল্পের আসরে বন্ধুদের সাথে,আত্মজদের সাথে হয়তো শেয়ার করি,করব। এর বাইরে বাড়তি কিছু নয়। নিজের সেসব গল্পরা থাক ডায়রির পাতায়। তারচে চলুন শুনি চেনা ইয়াঙ্গুনের অচেনা গল্প।

ফিরে দেখা মিয়ানমার
প্রাচীন ব্রহ্মদেশ নামে পরিচিত দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার দেশ বার্মা একাধিকবার নাম পরিবর্তনের বিপাদে পড়েছে। একসময়ের বার্মা বা বর্মা এখন সারাবিশ্বের কাছে মিয়ানমার নামেই পরিচিত। ১৯৮৯ সালে বার্মা থেকে নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার করা হয়। বদলে ফেলা হয় রাজধানীর নামও। সাবেক রেঙ্গুন শহর তাই ইয়াঙ্গুন হয়ে গেছে কলমের খোঁচাতে। যদিও এখন ইয়াঙ্গুন নয়,নতুন রাজধানীর নাম ‘নেপিডো’ নামের নতুন এক শহর। ২০০৫ সালে রেঙ্গুনকে বাদ দিয়ে রেঙ্গুন থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরের নেপিডো’কেই রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের ঠিক ১ বছর পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি স্বাধীনতা লাভ করে ব্রিটিশদের কাছ থেকেই। স্বাধীনতার মাত্র কয়েকমাস আগে আততায়ীর গুলিতে মারা যান দেশটির স্বাধীনতার স্বপ্ননায়ক জেনারেল অংসান। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত গনতান্ত্রিক পথেই এগোচ্ছিলো দেশটি। কিন্তু ১৯৬২ সালে দেশটির সামরিক বাহিনী ক্ষমতার কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এর দীর্ঘসময় পর ১৯৯০ সালের ২৭ মে প্রথম নির্বাচন দেয় দেশটিতে সামরিক সরকার। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয় অং সান সূচীর ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি,যারা ৪৯২ টি আসনের মধ্যে ৩৯২ টি আসসে জয়লাভ করেছিলো। কিন্তু বিজয়ী হয়েও ক্ষমতা বসতে পারেনি দলটি। বরং দলটির শীর্ষ নেত্রী অং সান সূচী দীর্ঘদিন গৃহবন্দী জীবন কাটিয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে গনতান্ত্রিক পরিবেশ সীমিত আকারে হলেও শুরু হয় দেশটিতে।

বর্মী ভাষা মিয়ানমারের সরকারী ভাষা। এই ভাষাতে দেশের প্রায় আশি ভাগ লোকই কথা বলেন। এছাড়াও আরো ১০০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে কারেন ভাষার বেশ কিছু উপভাষা এবং শান ভাষার উপভাষা, আরাকান ভাষা, চিন ভাষা,জিংপো ভাষা, লু ভাষা এবং পারাউক ভাষা’য় কথা বলেন অনেকেই। দেশটির মুদ্রার নাম কিয়াত।

যেখানে অবস্থান দেশটির
৬৭৮,৫০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের (২৬১,৯৭০ বর্গমাইল) বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত মিয়ানমার। দেশটির পশ্চিমে বাংলাদেশের চট্টগ্রম বিভাগ এবং ভারতের মিজোরাম, উত্তর-পশ্চিমে ভারতের আসাম, নাগাল্যান্ড ও মণিপুর অবস্থিত। মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাংশের ২,১৮৫ কিলোমিটার জুড়ে আছে তিব্বত এবং চীনের ইউনান প্রদেশ। দক্ষিণ-পূর্বে লাওস ও থাইল্যান্ড। দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের সাথে মিয়ানমারের ১,৯৩০ কিলোমিটার উপকূল রেখা রয়েছে।

এয়ারপোর্ট থেকে কিভাবে যাবেন শহরে
মিয়ানমারের এয়াপোর্টটি শহরের প্রাণকেন্দ্র শ্যোলে প্যাগোডা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। আপনি এয়ারপোর্ট থেকে বের হলেই দেখবেন দাঁড়িয়ে আছে বাস। যদি সস্তায় যেতে চান তবে সরাসরি বাসে যেতে পারবেন আপনি শহরে। ১৫/২০ মিনিট পরপরই বাস ছাড়ে। ভাড়া মাত্র ৫০০ কিয়াত। মজার ব্যাপার হলো,বাসে উঠার আগে ভাড়া যেনে ভাংতি সেই টাকা হাতে নিয়ে উঠবেন এবং চালকের পাশের বক্সে নিজেই ফেলে দিবেন। চালক ছাড়া বাসে কেউই নেই ! কেউ আপনার ভাড়াও নিবেনা কিংবা বড় নোট বদলিয়ে দেয়ার কেউ থাকবে না। এজন্য বিমান থেকে নেমেই লাগেজ নিয়ে কিছু ডলার এক্সচেঞ্জ করে কিয়াত করে নিবেন,যাতে বিড়ম্ভনা এড়াতে পারেন। এয়ারপোর্ট বুথ থেকেই টেলিনর কিংবা যেকোন কোম্পানীর একটি সিম কিনে পারেন প্যাকেজসহ মাত্র ১৫০০ কিয়াতে।

এয়ারপোর্টের বাইরের এই বাসেই চেপে বসবেন হাতে কিয়াত নিয়ে

আর যদি একটু আরামে যেতে চান তবে গ্রাব বা টেক্সি নিতে পারেন। আর এজন্য সহজ উপায়টাই হচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকেই সিম নিয়ে বা ওয়াইফাই সাপোর্ট নিয়ে গ্র্যাব এপটি ডাউনলোড করে নিয়ে নিজেই ডাকা। গ্র্যাব ভাড়া আনুমানিক ৬০০০ কিয়াত হতে পারে। তবে টেক্সি নিলে এই ভাড়া পড়বে আনুমানিক ১৫,০০০ কিয়াত।
এয়ারপোর্ট থেকে আপনার শহরে পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগবে এবং এটা নির্ভর করছে সেই সময় শহরের ট্রাফিক জ্যাম কেমন তার উপর ! ও আরেকটি তথ্য দিয়ে রাখি, বাংলাদেশী ১০০ টাকার মূল্য সেখানে প্রায় ১৬০০ টাকা ! যদিও এটা নির্ভর করবে সেই সময়কার মুদ্রা বিনিময় হারের উপর।

 

 

 

কি দেখবেন ইয়াঙ্গুন শহরে
ইরাবতী নদীর তীরে অবস্থিত শহর ইয়াঙ্গুন। এখন আর রাজধানীও নয় শহরটি। তবে দেশের সবচে পুরনো,সবচে বড়, সবচে চেনা শহর এই ইয়াঙ্গুন এককালে রেঙ্গুন নামেই পরিচিত ছিলো।  ১৯৬২ সালে এশিয়ার সবচে ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত মিয়ানমার এখন একই মহাদেশের অন্যতম দরিদ্র দেশ। কিন্তু বিশাল আয়তনের দেশটি দীর্ঘ অবরোধ আর আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরও কি করে এতোটা সমৃদ্ধ এখনো তাও বেশ বিস্ময়ের। ৬ লক্ষ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বড়। এক পলক শহর ঘুরেই আপনি নির্দ্বিধায় ইয়াঙ্গুন শহরকে জলাভূমির শহর বলতেই পারেন। শহরজুড়ে এখানে সেখানে অসংখ্য পুকুর কিংবা ছোট ছোট পানির আধার। আর শহরের বুকেই তো চুপচাপ শুয়ে আছে যেনো দুই লেক, ইনিয়া ও খান-ড্য জি। ইনিয়া লেকের পাড়েই অং সান সূচীর পৈত্রিক বাড়ী। হ্রদের পাড়জুড়ে হাঁটার চমৎকার আয়োজন। অনেক জায়গায় অবশ্য চলছে নির্মাণযজ্ঞও। খান-ড্য-জি লেকের পাড়ে অবস্থিত রাজকীয় রেস্টুরেন্ট ‘কারাওয়েইক প্যালেস’। সেগুনের জনপদ মিয়ানমারের আসবাবপত্র নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যাপকভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে বিশ্বখ্যাত বার্মা টিক। ইয়াঙ্গুন শহরে শ্যোয়েডন প্যাগোডা,শ্যোলে প্যাগোডা,বোটাটং প্যাগোডা, চক্তাতগি প্যাগোডা, ৪৫ ফুট উচু বুদ্ধমূর্তি, বোগিওকে পার্ক, বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধী,দুই লেক ইনিয়া ও খান-ড্য জি,স্বাধীনতা স্তম্ভ, চায়না টাউন,উথান্ট এর বাসভবন, সূচীর বাসভবন, শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা,বিশ্ববিদ্যালয়,জাতীয় যাদঘুর দেখতে পারেন। যেতে পারেন একটু দূরের বাগান সিটিতে। আর অবশ্যই ফুটপাতের স্থানীয় খাবার,নুডলস,ভাত এবং নানান পদের সবজী খাবেন। খাবারের দাম খুবই সস্তা এখানে।

কখন যাবেন ইয়াঙ্গুন !
আপনি বছরের কোন সময় মিয়ানমার বেড়াতে যাবেন সেই সিদ্ধান্তটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রচন্ড গরম সেখানে। সাধারন মিয়ানমারে গরম ও ঠান্ডার দুটি ঋতু। অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম এবং মে এবং জুন সবচে গরম সময়। মে থেকে অক্টোবরের প্রথম দিক পর্যন্ত ঠান্ডার সময়। নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাস সবচে ঠান্ডার সময়। সব বিবেচনায় অক্টোবর থেকে ফেব্রæয়ারি মাসই মিয়ানমারে ঘুরতে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়।

 

একটি দূর্ঘটনা এবং…
আমি যখন ইয়াঙ্গুনে সেই সময় ৮ মে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মিয়ানমারের ইয়াংগুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে বিমান বাংলাদেশের একটি উড়োজাহাজ ছিটকে পড়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে ইয়াংগুনগামী ড্যাশ ৮কিউ-৪০০ উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়ে। বিমানটি মোট ৩২ আরোহী ছিলেন এবং এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আমি বিষয়টি জানতে পারি মেসেঞ্জারে ঢাকা,রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম থেকে একের পর এক বন্ধু,সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের ফোন কলে। যেহেতু মিয়ানমারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত এবং বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া অনুপস্থিত, সঙ্গতকারণেই ঢাকার মিডিয়াও এই দূর্ঘটনার খবর পাচ্ছিলো না ঠিকমত। তাই ফেসবুকের কল্যাণে আমার ইয়াঙ্গুন অবস্থানের খবর জেনে ঢাকার অন্তত: ১১ টি টিভি চ্যানেল থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয় তথ্য সহায়তা এবং লাইভ করার জন্য। কিন্তু যেহেতু আমি ট্যুরিষ্ট ভিসায় গেছি এবং সেখানকার বাস্তবতা ভিন্ন,তাই আমি সেইসব ফোনের জবাবে নিজের অপারগতা জানাতে বাধ্য হই এবং তারাও বাস্তবতাটা বুঝতে পারে। তবুও স্থানীয় একটি সূত্রকে কাজে লাগিয়ে সংগ্রহ করা এয়ারপোর্টের দুর্ঘটনার ৪ টি ছবি আমি সংগ্রহ করতে পারি এবং সেখানকার স্থানীয় একটি ইংরেজি অনলাইনের নিউজ লিংক পাঠাই সেইসব টিভি ও পত্রিকার সংশ্লিষ্টদের। পরে নিজেই অনলাইনে দেখেছি আমার দেয়া ছবি ব্যবহার করেছে দেশের অনেক গণমাধ্যমই। সেদিন আমার পেশাগত জীবনের একটি ব্যর্থতার দিনই বলা যায়। চোখের সামনে নিজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা,নিজেই একমাত্র সংবাদসূত্র। সামনে ‘হিরো’ হওয়ার সুযোগ। কিন্তু নাহ্ ! জীবন কি আর সবসময় সব সুযোগ কাজে লাগাতে দেয় ! বাস্তবতা যে বড্ড কঠিন। সেইদিন সামান্য সময়ের জন্য হলেও মনে হয়েছে,মিয়ানমার হয়তো অনেক কিছুতেই আমার দেশ থেকে এগিয়ে গেছে বা আছে,কিন্তু কথা বলার,মত প্রকাশের এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নে আমরাই যোজন যোজন দূর এগিয়ে। অন্তত তাদের চেয়ে।

পরাজিত এক বাদশার সমাধীতে !

মিয়ানমারে আসার আগে আমার জানাই ছিলো শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর জীবনের শেষ দিনগুলো এখানেই কাটিয়েছেন নির্বাসনে এবং তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের সমাধীও এখানে। মুসলিম গাড়ি ড্রাইভারের কাছে শুনেই আগ্রহ জন্মালো এবং গুগলে সার্চ দিয়ে তো আমিই অবাক ! আরেহ্, এটা দর্শন না করলে যে অন্যায় হবে। সাথে সাথেই দে ছুট্ ! ছিমছাম ছোট্ট একটি বাড়ি,যাদুঘর কিংবা স্মৃতির সমাধী ! দেয়ালে ঝোলানে পেইন্টিং আর ইতিহাসের নানান নির্মোহ বর্ণনা ! ছবি গ্যালারি দেখে তো আমি অবাক,ভারতীয় রাষ্ট্রপতি,পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী,বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অসংখ্য বিশিষ্টজনদের পদচিহ্ন পড়েছে সেখানে ! কে ছিলেন এই বাহাদুর শাহ জাফর ! এখানেই কি করে এলেন ? কেনোইবা এখানেই সমাধীস্থ হলেন ! আসুন, একটু জানার চেষ্টা করি-

শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে হঠাৎ করে তাঁর কবর আবিষ্কৃত হবার পর তাঁকে নিয়ে মানুষের মধ্যে আবার নতুন করে আগ্রহ মাথা চাড়া দিয়েছে। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর নিজে একজন সুফি সাধক ছিলেন এবং ছিলেন ঊর্দু ভাষার প্রথিতযশা একজন কবি। ১৮৬২ সালে তদানীন্তন রেঙ্গুনে (আজকের ইয়াঙ্গুন) একটা জরাজীর্ণ কাঠের বাড়িতে তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন পরিবারের গুটিকয় সদস্য। যে ব্রিটিশদের হাতে তিনি বন্দি ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর দিনই তারা বিখ্যাত শোয়েডাগন প্যাগোডার কাছে এক চত্বরে অজ্ঞাত এক কবরে তাঁকে দাফন করে। পরাজিত, অপমানিত ও হতোদ্যম দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের জন্য সেটা ছিল ৩০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল মোগল সাম্রাজ্যের গৌরবহীন পতনের এক অধ্যায়।

তাঁর মোগল পূর্বপুরুষরা ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে- যার মধ্যে ছিল বর্তমানের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাংলাদেশ। তাঁর পূর্বপুরুষ আকবর বা ঔরঙ্গজেবের বর্ণময় শাসনকালের মতো দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের শাসনকাল হয়তো তেমন গৌরবোজ্জ্বল ছিল না কিন্তু তাঁর ক্ষমতাকাল জড়িয়ে গিয়েছিল ‘সিপাহী বিদ্রোহের’ সঙ্গে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিশাল অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। ওই অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার পর সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার দায়ে মামলা করা হয়, তাঁকে বন্দি করা হয় ও ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন বর্তমানের মিয়ানমারে (সাবেক বার্মায়) তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়। বন্দি অবস্থায় ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কবিতাগুলো মরে নি। তিনি লিখতেন ‘জাফর’ ছদ্মনামে। জাফরের অর্থ বিজয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে ক্ষমতাধর একটি শাসককুলের অবসান ঘটেছিল। সমর্থকদের তাঁর কাছ থেকে দূরে রাখতে ব্রিটিশরা তাঁর কবর নাম-পরিচয়হীন রেখে দেয়। তাঁর মুত্যুর খবর ভারতে পৌঁছায় দুই সপ্তাহ পরে এবং সে খবর প্রায় লোকচক্ষুর অগোচরেই থেকে যায়।

১৭০০র শেষ নাগাদ বিশাল মোগল সাম্রাজ্য ছোট হয়ে আসে। ওই এলাকায় মোগলদের প্রতিপত্তিও কমতে থাকে। ১৮৩৭ সালে জাফর যখন সিংহাসনে বসেন তাঁর রাজ্য ছিল শুধু দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকা জুড়ে। কিন্তু তাঁর প্রজাদের কাছে তিনি সবসময়ই ছিলেন বাদশাহ্। অন্যান্য মোগল সম্রাটদের মত তিনিও মঙ্গোলীয় শাসক চেঙ্গিস খান এবং তৈমুর লংএর প্রত্যক্ষ বংশধর ছিলেন।

এরপর ইতিহাসের পাতায় চলে গেছে বছরের পর বছর, মানুষের মন থেকে প্রায় মুছেই গিয়েছিলেন পরাজিত বাদশা বাহাদুর শাহ্ জাফরের স্মৃতি । কিন্তু মৃত্যুর ১২৯ বছর পর ১৯৯১ সালে আকস্মিকভাবে তাঁর কবর উদ্ধার হলে মানুষের স্মৃতিপটে আবার ফিরে আসেন অবিভক্ত ভারতের কিংবদন্তী শেষ মোগল সম্রাট । ১৯৮০র দশকে ভারতের একটি টেলিভিশনে ধারাবাহিক তৈরি হয় তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে। দিল্লি এবং করাচিতে তাঁর নামে রাস্তা আছে, ঢাকায় একটি পার্কের নামকরণ হয় তাঁর নামে। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল, যিনি লাস্ট মুঘল বইটির লেখক, তিনি বলেছেন ‘জাফর একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন।’

ইসলামী শিল্পরীতিতে পারদর্শী, তুখোড় কবি এবং সুফি পীর জাফর হিন্দু-মুসলমান ঐক্যকে গভীর গুরুত্ব দিতেন। জাফর কখনও নিজেকে বীর বা বিপ্লবী নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি, তাঁর ব্যক্তিত্বও সে ধরনের ছিল না, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষ সম্রাট আকবরের মত তিনিও ইসলামী সভ্যতার একজন আদর্শ প্রতীক ছিলেন, যে সময় ইসলামী সভ্যতা তার উৎকর্ষে পৌঁছেছিল এবং সেখানে পরমতসহিষ্ণুতা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ডালরিম্পিল লিখেছেন তার বইতে। জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল তাঁর মিশ্র ধর্মের পরিবারে বড় হয়ে ওঠা। তাঁর বাবা ছিলেন দ্বিতীয় আকবর শাহ্ আর মা ছিলেন হিন্দু রাজপুত রাজকুমারী লাল বাঈ।

১৮৫৭র সিপাহী বিদ্রোহে ১০ মে উত্তর ভারতের মেরাট শহরে ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দিল্লি, আগ্রা, লক্ষ্নৌ ও কানপুরে।

নতুন সংস্কার, আইন, পশ্চিমা মূল্যবোধ এবং খ্রিস্টান ধর্ম চাপিয়ে দেবার চেষ্টার প্রতিবাদে ছিল এই বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম সৈন্য, যারা তদানীন্তন মোগল সম্রাট, দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরকে তাদের নেতা মেনে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ জেনারেলরা তাদের বিদ্রোহ দমনে মোতায়েন করেছিলেন পাঞ্জাব থেকে শিখ সৈন্য এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে পাঠান সৈন্যদের। দিল্লির নিয়ন্ত্রণ তারা আবার নেন সেপ্টেম্বরে।

দুই তরফেই নির্বিচার হত্যার অভিযোগ ছিল। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ নারী ও শিশুদের হত্যা করেছিল। ব্রিটিশদের হাতে নিহত হয়েছিল হাজার হাজার বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকরা।

১৮৫৮ সালের জুলাই মাসে এই বিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। একই বছরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলুপ্ত করে দেয়া হয় এবং ভারত ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ শাসনের আওতায় আসে।

ইয়াঙ্গনের নিরিবিলি এক রাস্তায় অবস্থিত দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের দরগা। ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে আবেগময় একটা সময়ের নীরব সাক্ষী বহন করছে বাহাদুর শাহ জাফরের এই সমাধিসৌধ। স্থানীয় মানুষ যদিও জানতেন স্থানীয় সেনা ক্যান্টনমেন্ট চত্বরের ভেতর কোথাও কবর দেওয়া হয়েছিল ভারতের শেষ মোগল সম্রাটকে, কিন্তু ১৯৯১ সালের আগে কেউ জানতে পারেনি কোনটি ছিল তাঁর কবর। সেখানে তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও কবর দেয়া হয়েছিল।

সেখানে একটি ড্রেন পাইপের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির সময় কিছু শ্রমিক একটি ইটের স্থাপনা দেখতে পায়, যেটি সাবেক সম্রাটের কবরের অংশ বলে জানা যায়। এরপর জনসাধারণের দানের অর্থ দিয়ে তা সংস্কার করা হয়। ভারতে জাফরের পূর্বপুরুষদের যেসব জমকালো সমাধি রয়েছে তার তুলনায় দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের এই সমাধিটি খুবই সাদামাটা। লোহার ফটকের গ্রিলে তাঁর নাম ও পরিচয় রয়েছে। একতলায় রয়েছে তাঁর একজন স্ত্রী জিনাত মহল এবং তাঁর নাতনি রৌনক জামানির কবর। সমাধিগৃহে এর নিচে রয়েছে জাফরের কবর- তার ওপর ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এসে ছড়িয়ে দেন গোলাপ ও অন্য ফুলের পাপড়ি।

ভারত-পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের মিয়ানমার সফরে যাওয়া মানেই যেনো শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধী দর্শন। ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সব রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের ছবি চোখে পড়লো সেখানে,যাতে আছেন আবুল কালাম আজাদ,মনমোহন সিং,নরেন্দ্র মোদি,আই কে গুজরালসহ অনেকেই। পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফ,পারভেজ মোশাররফ,বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সহ আরো অনেকেরই ছবি দেখলাম সেখানে….

মাথায় লম্বা ঝাড়বাতি, দেয়ালে তাঁর প্রতিকৃতি। পাশে একটি মসজিদ। ইয়াঙ্গনের মুসলিমদের কাছে এই দরগা খুবই পবিত্রস্থান। সর্ব স্তরের মানুষ আসেন এই দরগায়, কারণ তিনি ছিলেন একজন সুফি সাধক। ঊর্দু ভাষার তিনি ছিলেন বিখ্যাত একজন কবি। জীবন ও প্রেম নিয়ে তাঁর রচিত গজল খুবই বিখ্যাত।

বন্দি অবস্থায় তাঁর কাগজ কলম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বলা হয় তিনি এসব গজল ও কবিতা লিখে গেছেন যে ঘরে তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল সেই ঘরের দেয়ালে কাঠকয়লা দিয়ে। তাঁর নিজেকে নিয়ে লেখা কয়েকটি কবিতা এই সমাধিতে খোদাই করা আছে। সম্রাট হিসাবে বাহাদুর শাহ্ জাফর কোন সেনাদলের নেতৃত্ব দেননি। কিন্তু হিন্দু ও মুসলিম সৈন্যরা তাঁকে নেতা মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্রোহ করেছিল। মোগল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দুই ধর্মের হাজারো মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন তার নেতৃত্বেই।

ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হয়ে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর হয়ত তাঁর রাজ্য, ক্ষমতা ও উপাধি হারিয়েছিলেন, কিন্তু একজন সুফি-সাধক, কবি ও ঐক্যের প্রতীক হিসাবে মানুষের অন্তরে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছিলেন তিনি।

ইয়াংগুণের খাবার দাবার
বাংলাদেশের বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এই দেশটির সাথে আসাদের যতই রাজনৈতিক বিরোধ থাকুক না কেনো, এর সাথে সাংস্কৃতিক ও জীবনাচারণগত ঐক্য যেনো তত বেশি। ইয়াঙ্গুন শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সিঙ্গারা চমুচা পরোটা বা পুরি ভাজতে দেখে আপনার মনে হতেই পারে,ঢাকার কোন অলি গলিতে হাঁটছেন কিনা ! এদের খাবারের ধরণ বাঙালীয়ানার ছাপ স্পষ্ট। তারা আমাদের মতোই ডান হাতে খাবার খায়, খাবারের সংগে সাধারণত পানীয় পরিবেশন করা হয় না, তবে পাতলা ঝোল জাতীয় খাবার থাকে। খাবারের বাইরে বর্মীদের প্রিয় পানীয় গ্রীন টি। ঐতিহ্যগতভাবে বর্মীরা বাঁশের মাদুরে বসে নিচু টেবিল থেকে খাদ্যগ্রহণ করে।
মাছের সস এবং নগাপী (সীফুড) জাতীয় মাছজাত দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার হয় তাদের রন্ধনপ্রণালীতে। মায়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, বার্মিজ রন্ধনপ্রণালী চীনা রান্না, ভারতীয় রান্না এবং থাই রান্নার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। মহিঙ্গা হচ্ছে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্রাতঃরাশ এবং জাতীয় খাবার। মিয়ানমারের লোকজন ফল খুব ভালোবাসেন,শহরের যত্রতত্র ফল কেটে বিক্রি হতে দেখবেন। নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি সালাদও খুব প্রিয় তাদের।

ইয়াঙ্গুনের রাতের জীবন
যেখানেই যাই,রাতের শহর দেখা আমার অন্যতম প্রধান একটি কাজ। ইয়াঙ্গুন নিয়ে ভীতি ছিলো,কিন্তু প্রথম রাতেই সেই ভয় উধাও। পৃথিবীর অন্যান্য শহরের মতো এখনো রাতের ইয়াঙ্গুন অন্যরকম। পুরো শহর ঘুরেছি আমি রাত তিনটা অবধি। সর্বত্রই নিরাপত্তার একটা ছাপ আছেই,তবুও যেনো অনেক উন্মুক্ত,প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা রাতের ইয়াঙ্গুন। অনেক রাত অবধি খোলা থাকে ডিস্কোগুলো। সেখানে মিয়ানমারের তারুণের‌্য উচ্ছাস দেখে আপনার মনেই হবেনা দীর্ঘ সামরিকশাসক আর গনতন্ত্রহীনতা দেশটি আদতে অবরুদ্ধই রেখেছে,পিছনে টেনে নিতে পারেনি।

তবে বিদায় ইয়াঙ্গুন…
আমি সাধারনত কোন জায়গাতেই দ্বিতীয়বার যেতে চাইনা। কিন্তু মিয়ানমারে সম্ভবত আবার যাব আমি। কেনো ? সেটা জানিনা…. তবে এটুকু বলতেই পারি, ইয়াঙ্গুন, আমার ভেতরে অন্য এক আমাকে খুঁজে নিজে সহায়তা করেছে,ইয়াঙ্গুন আমাকে জানিয়ে দিয়েছে‘ ওকে আমার ভালোবাসা উচিত,আরো বেশি…আরো কাছে গিয়ে’……কটা দিনের অসাধারণ দিনযাপন শেষে যখন ইরাবতী পাড়ের শহর ইয়াঙ্গুন ছেড়ে বিমানবন্দরের শেষ বাঁধাটি পাড় হচ্ছিলাম,একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে ছিলাম কয়েক সেকেন্ড,ঘাড় ফেরানোর আগেই চোখ ভিজে আসে….এটা আমার সবসময়ই হয়,যে দেশটাকে পেছনে ফেলে আসি,তার জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠে,কদিনের চেনা শহর,চেনা মানুষ,অজস্র স্মৃতি পেছনে ফেলে আসার দগদগে ক্ষত… এই আমার কোন ফেরার স্মৃতিই তাই কখনই ‘অসাধারন’ হয় না, বুকের বাঁ পাশে চিনচিন ব্যাথা নিয়ে , শুধু মনে হয়- ‘কিছু কি ফেলে এসেছি !’

One comment

  1. লেখা পড়ে মিয়ানমার যাবার ইচ্ছাটা খুব প্রবল হলো।অসাধারণ লেখা, বিশেষ করে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নিয়ে কিছু তথ্য অসাধারণ ছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen − one =