পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ…

‘সুতো ছিঁড়ে তুমি গোটালে নাটাই
আমি তো কাঙাল ঘুড়ি
বৈরি বাতাসে কী আশ্চর্য !
একা একা আজো উড়ি’
মাবিলার মার সাথে আমাদের কারো দেখা হয়না বহুদিন। ভালো আছে কিনা জানিনা। জানিনা এখনো শীতের ভোরে সিক্ত শিশিরে হেঁটে বেড়াতে ভালোবাসে কিনা ? শুধূ জানি,ভালোবাসা বেঁচে আছে জোনাকী রাতের সাথে রোদ্দুরে বৃষ্টিতে—। কী ভীষণ একাকীত্ব নিয়ে আমি আর আমাদের বেঁচে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় জল ঢেলে দেয় তোমার সুখের সংসার। আমি ভালো থাকি,তুমিও। আমাদের আলাদা আলাদা ভালো থাকা জন্ম দেয় বহু প্রশ্নের । হিসেব মেলেনা জীবনের। পেছনে ফেলে আসা স্মৃতির কপাট খুলে তোমার পুরনো ভালোবাসা আর আর এককালের অমলিন বিশ্বাস নিয়ে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে আমার সময়ে। তুমি দুর থেকে দোয়া করো,আমার ভালো থাকার। তুমিও ভালো থেকো—,সুখেও।

 

‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ , রক্তে জল ছলছল করে
নৌকোর গলুই ভেঙে উঠে আসে কৃঞ্চা প্রতিপদে
জলজ গুল্মের ভারে, ভরে আছে সমস্ত শরীর
আমার অতীত নেই , ভবিষ্যতও নেই কোনখানে।’
প্রতিটি ভুলই এক একটি শুদ্ধতার পথ দেখায় । আর দুঃখ হচ্ছে জীবনের এমন একটি অলঙ্কার যা জীবনকে শুদ্ধ করে , পরিপূর্নতা আনার চ্যালেঞ্জ এনে দেয় মনে, প্রাণেও। কিন্তু ভুল থেকে , বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নেয়ার কিংবা পথের অবলম্বন খুজে নেওয়ার প্রবণতা খুবই কম আমাদের দেশে । যে যার , যে যার ব্যর্থতা আড়াল করতেই , লুকোতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে । রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি র্ধূত ও কৌশলী। জনতার সাথে সাপলুডু খেলায় প্রতিদিন ,নিত্যসময় মেতে উঠে এদেশীয় রাজনীতির পেশাদার খেলোযাররা । খুবই সুকৌশলে , দক্ষতার সাথে । তাই তো আমরা দেখি অনেক রক্তের স্রোতধারা পেরিয়ে শেষতম অবলম্বনের মত দাঁড়িয়ে থাকা ‘র্পাবত্য শান্তি চুক্তি ’ বাস্তবায়ন হয়না অজানা কারণে , কারো ভুলে — কারো আপোষকামিতায়– , কারো সুবিধাবাদে —, কারো সংহিসতায় ও বটে! শান্তি চুক্তি হয় , শান্তি আসেনা । রক্ত ঝড়ে ফুরোমন , সাজেক আর চিম্বুকের পাদদেশে । উচ্চ শিক্ষার জন্য ঘর ছাড়া পাহাড়ী যুবকের গ্রামে ফেরা হয়না (অথবা ফিরতে পারেনা ) ‘আপোষকামী আর সুবিধাবাদী’ র্বিতকে। লাশ হয়ে যাবার ভয়েও। এখন ভয়ের সময় , সংহতির নয়।এখন লাশের উৎসব , শান্তির নয় । খাগড়াছড়ি ষ্টেডিয়ামে উড়ানো সাদা পায়রা গুলি এখন কোথায় কে জানে? ওরাও কি তবে পালিয়ে গেছে শান্তির স¤ভাবনাহীনতা দেখে ? কি জানি- হয়তবা। তবুও আমরা শান্তিকামী মানুষ আশায় বুক বাঁধি, নতুন আলোর ভোরের প্রত্যাশায় । অপহরণ , খুন, জিঘাংসা বন্ধ হয়ে আবারও জুম পাহাড়ে ভালোবাসার গান গেয়ে উঠবে কোন জুম্ববী , ভালোবাসায়— উচ্ছাসে— ,। সেদিন কি খুউব বেশি দুরে— ।

‘রুদ্ধশ্বাসঃ এ শহর ছটফট করে সারারাত
কখন সকাল হবে
জীয়ন কাঠির র্স্পশ পাওয়া যাবে
উজ্জল রোদ্দুরে—–’
ক্রমশঃ শ্রীহীন হয়ে পড়ছে র্পাবত্য চট্টগ্রাম । আমার ভালোবাসার শহর রাঙামাটি । বন মোরগ ছুটে বেড়ানো পাহাড় গুলির মুন্ডু কর্তন শুরু হয়েছিল বহু আগেই , এখনই অস্তিত্বহীন। পাহাড় কেটে গড়ে তোলো হচ্ছে ইমারত , প্রশাসনের নাকের ডগায় , আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনও জড়িত অনেক স্থানে। অবাধে বৃক্ষ র্কতন চলছে ,ক্রমেই বৃক্ষ শুন্য হয়ে পড়ছে র্পাবত্য অরন্য ।রির্জাভ ফরেষ্টের চারপাশে বৃক্ষ আছে ঠিক কিন্তু মাঝখানে মাইলের পর মাইল ফাঁকা , বৃক্ষ শুন্য । এ দায় কার? কাপ্তাই লেকও মৎস শুন্য হয়ে পড়েছে, অজস্র প্রজাতির মাছ বিলীন আজ । মাছ-গাছ আর বাঁশ ব্যবসায়ীরা আমাদের বারোটা বাজিয়েছে ।অথচ এরাই আজ আমাদের নেতা, জনপ্রতিনিধি , অথবা দলীয় পৃষ্ঠপোষক। বাঃ কি চমৎকার ঐক্য ! পাহাড়ে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসছে হাতির পাল , হরিন শুন্য হয়ে পড়ছে মানবীয় লোভে , কত অসংখ্য , অজস্র প্রজাতির পশু পাখি যে হারিয়ে গেল , হারিয়ে যাচ্ছে সে খবর কে রাখে ? বন বৃক্ষ শূণ্য হলে কার কি ? হ্রদে মাছ না পেলে কি এমন ক্ষতি আমরা তো প্রতিবেলা মাছ—। কেউ দাঁড়াবেনা বুক টান করে , সাহস নিয়ে । এই সময়ের তারুণ্যকেই রুখে দাড়াতে হবে নিজেদের ভবিষ্যত ভাবনায় সমৃদ্ধ হয়ে , পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগী একটি শহর রেখে যেতে । আসুন আজ, এক্ষুনি, হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে যাই প্রতিরোধে– প্রতিবাদে — দ্রোহে।

‘মানুষের মনে , নাকি মানবিক আত্মœায়
পড়েছে পলেস্তরা
বোধে আর প্রেমে তাই বসেছে পাথর , নাকি
হিংস্রতায় ভীত- সন্ত্রস্ত আমাদের পুষ্পিত বসুধরা।’
মাদকের বিষাক্ত নীল ছোবল এখন পাহাড়ি প্রতিটি শহরে । যে পাহাড়ী যুবক জুমে মায়ের পিঠে সওয়ার হয়ে জীবন ঘষে ঘষে মৃত্তিকার অবিরল ভালোবাসা আর সোঁদাগ›ধ নাকে নিয়ে বেড়ে উঠছে তার হাতে কে , কারা তুলে দিল ভয়ঙ্কর মাদক ? কোন সে অপশক্তি পাহাড়ের তারুণ্যের মেরুদন্ড ভেঙে চৌচির করে দেয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত । আজ এখানে মুড়-মুড়কির মত বিক্রি হচ্ছে ফেনসিডিল , গাঁজা। অন্যান্য মাদকদ্রব্য ও দুষ্প্রাপ্য নয় । প্রশাসন জানে ,পুলিশ জানে , নেতারা জানে, আমি জানি, আপনি জানেন কারা এইসব নিষিদ্ধ পণ্যের বিকিকিনি করছে , কোথায় করছে , কিভাবে করছে। তবুও অপরাধী ধরা পড়ছে না কেন ? নাকি ধরা হচ্ছেনা ! তবে কি আমরা আশির দশকের পার্বত্য চট্টগ্রাম কালে প্রচলিত মাদক প্রচার তত্ত্বটির বিশ্বাসযোগ্যতা মেনে নিব , সত্যতা মেনে নিব? প্রশ্ন রইল সংশ্লিষ্টদের কাছে । উত্তর দেবার আনুষ্ঠানিক, বা অনানুষ্ঠানিক প্রয়োজন নেই । মাদক ব্যবসায়িদের গ্রেফতার ও চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আপনাদের ‘মৌনতা’ বা ‘তৎপরতা’ প্রশ্নটির সঠিক উত্তরে (হ্যাঁ অথবা না ) টিক চিহ্ন দিতে অথবা সিন্ধান্ত নিতে আমাদের সহযোগিতা করবে ।

‘কৃঞ্চচূড়া বিরহে উড়ে রাধাচুড়া চৈত্র্যের ধুলো
কোন শোকে পাতা ঝরে
ঝরে আমার বিষন্নতাগুলো—-’
কিছুই ভালো লাগেনা আর। শৈশবের কত শরতে চিম্বুক আর ফুরোমনের শহরে বুনো সৌর্ন্দয চাঁদ আর আমি এক অবাক মৌনতায় ভালোবাসায় ভিজে ভিজে শুদ্ধ হয়েছি , ঋদ্ধ হয়েছি । আমার ছেলে বেলায় খালি পায়ে এইসব পাহাড়ি জনপদের সোঁদামাটির গন্ধ বুকে বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে দাবড়ে বেরিয়েছি আমি,আমরা,তুমিও কি নও ? আজ তবে বহুকোষী মাল্টিন্যাশনাল ত্রাস ,মাছ-গাছ-বাঁশের ফেরিওয়ালাদের পুঁজিবাদী আস্ফালন , উন্নয়নের নামে এনজিও সংস্কৃতির বিকাশ (সাম্রাজ্যবাদ),এসি-নন এসি হোটেল (রঙ মহল),পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প (রক্ত বিদ্যুৎ প্রকল্প),পিকনিক স্পট (যাত্রা শিল্পীর মতো কৃত্রিম সাজে),আদিবাসী সংস্কৃতির বিশ্বায়নের নামে বিদেশী উন্নয়নকর্মী ( নাকি নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিনিধি)’র সামনে আমার বোনের বোতল আর বাঁশ নৃত্য,পিননখাদি ছেড়ে প্যান্ট- শার্ট-স্কার্ট-শোভিত আদিবাসী মেয়ে , সংস্কৃতির শিকড় ভোলা ক্যারিয়ার সর্বস্ব জুম পাহাড়ের ছেলে ,মনোজগতে ছড়িয়ে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতার ভূত, এইসব ভুলে ,মননের নিউরন থেকে মুছে ফেলে- আমি চলে যেতে চাই ,পালাতে চাই ,এ শহর ছেড়ে ! দূরে—-বহুদূরে—–। কিন্তু এ শহর ছেড়ে আমি কোথায় যাবো ? আমার অতীত নেই কোন । শুধুই আবর্ত বর্তমান। আমার শেকড় আঁকড়ে আছে এ শহরের মাটি আর ডুবে যাওয়া রাজপ্রাসাদের স্মৃতিমাখা পলেস্তারা। তোমাদেরও কি নয় ?

‘আমিও মানুষ বটে
আমারও একলা রাতে বড় একা লাগে
জ্যোৎস্নার জলে স্নান সেরে থোকা থোকা
কষ্ট পেড়ে আনি
ভালোবাসা আমাকেও ভীষণ কাঁদায়।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fourteen − two =