এখনো গোপন রক্তক্ষরণে বৃষ্টির মুখরতা…

অন্তজঃ বৃক্ষের গল্প—–
গল্পের খোঁজে ..স্বপ্নের খোঁজে পথে পথে ঘোরে ছেলেটি । বহুকাল। দীর্ঘ অনেকগুলি বাউরি বসন্ত।মেঘ আসে মেঘ কাটে।আকাশও রঙ বদলায়। জীবনের প্রয়োজনে বদলায় সমাজ- সংসার পরিচিতজন। আরো কত কি! রাষ্ট্রক্ষমতায় কত যাবতীয় উত্থান পতন । কলের ইঞ্জিনের জায়গায় ইলেকট্রিক ট্রেন । ফানুস ছেড়ে মানুষ নিজেই উড়ে নিজস্ব যানে । কালবেলার স্রোতে হারায় Ñ বেহুলা-লক্ষীন্দর ,শিরী- ফরহাদ , কিংবা রোমিও- জুলিয়েট। তবু ও বালক বেলার মেঠো পথ,পাহাড়ী ঝর্ণা, নীল হরিণী চোখের ভেজা কামিজের আদিবাসী মেয়ে,পাহাড় চূড়া থেকে আমলকী পেড়ে আনা বোকা বালকটি, সময়ের সাথে সাথে যুবক হয়ে উঠে, হয়ে উঠে গল্পকার । স্বপ্নকারও কি নয়? মফস্বলের প্রতিভাবান সেই স্বাপ্নিক অচেনা যুবকটিই আমাদের গল্পের নায়ক । মহানায়ক । একদিন এ শহর ছেড়ে পালিয়ে যাবে আমাদের গল্পের নায়ক । আমাদের পাড়ার মোড়ের শিউলি গাছটাও কাঁদবে তার শোকে…বিরহে…। শুধু কাঁদবেনা ৩৭০ কিলোমিটার দূরের শহরের কোন এক মেঘবতী মেয়ে।

মানুষ জাগবে ফের—-
একদিন চিঠি পর্ব শেষ হয় । শুরু হয় দাহকাল । অনন্তকালের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয় এককালের দুরন্ত ভালোবাসা .. বন্ধুত্ব .. সম্পর্ক। রক্ত ঝরে । কান্না ঝরে। বৃষ্টি ঝরে । ঝরে গাছের পাতাও। হলুদ রঙ ধারণ করে। বিবর্ণ হয়। সেই প্রেম – সেই অঙ্গীকার .. সব মিথ্যে । সবটাই মেকী ! অভিনয় ! হাঃ হাঃ হাঃ। এক জীবনে মানুষ কত কি পারে । কত বার হারে। কতভাবেই হারে । তবু ও জীবন বেঁচে থাকে জীবনের তরে । কারণ সত্যিকারের মানুষ.. মনুষ্যত্ব.. ভালোবাসাবোধ হারেনা কোনদিন । হারে না কখনই । জীবনই জয়ী হয় শেষাবধি । উষর মরুতেও তাই ফোটে শুভ্রতার সবুজ । মানুষই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে অমানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে .. প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়ে । জীবনের যা কিছু ভালো আর শুভবোধের জন্মদায়ক, তা থেকে গড়ে নিতে হবে নিজস্ব স্বপ্ন,মানবিক মূল্যবোধ। জীবন জয়ের পথেই মিলবে-সততা আর সত্যিকারের ভালোবাসার পুরষ্কার।

পুড়ছে জীবন বিজ্ঞাপনের আগুনে—–
বর্গীরা নিয়ে যায় সব । ভিটে মাটি .. গার্হস্থ্য সংসার । সংসারের নিপুণ কর্ত্রীকেও। কিনে নেয় সাংসারিক সুখ । যাবতীয় আনন্দ বেদনা । ফিসফাস … কানাকানি । শীতঘুমে লেপের নীচের যুগল উত্তাপ । ভালোবাসাও। কান্নাগুলি শুধু পড়ে থাকে নিজস্ব নিয়মে অবহেলায়..অনাদরে । রাজপ্রাসাদের লনের এক কোণে । যাবতীয় দাম্পত্য সুখ বেচা কেনা হয় তোমাদের বাজারে । খুঁনসুটির কেজি মাত্র ২ টাকা । উত্তাপ- উত্তেজনার প্যাকেট ১০ টাকা । প্রাকৃতিক সময় .. অসময় নয়, মন চাইলেই ঢুকে পড়া যায় কিনে নেয়া নিজস্ব গহ্বরে ,প্রতিরোধকবিহীন ,বিনা ঝুঁকিতে, যেখানে সেখানে ,নগরে- মফস্বলে । পুঁজির পাহাড়ের বাহারী প্রয়োগে তোমাদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে তিনতারা,পাঁচতারার সুরোম্য জীবন, অথবা ফরেস্ট হিলের নির্জন বাংলো। ইচ্ছে হলেই শুয়ে পড়ো যে কোন সেলিব্রেটির সাথে।মাত্র একটি রাত অথবা নিয়মিত। চরিত্রে সামান্য আঁচড়ও পড়বেনা তোমাদের,কেউ জানবেই না। তোমরা তো আর রহিমুদ্দীন করিমুদ্দিনের বাপ না ! যে কিনা গত হাটবারে ফুলতলী বাজারে পসরা বিক্রির শেষে মাত্র বিশ টাকায় শুয়েছিলো বেশ্যাপাড়ার এক মেয়ের সাথে। নিয়মিত টাকা দেয়া নিয়ে কী এক সমস্যা হলে পুলিশ পাড়ায় হানা দিলে আরো অনেকের সাথে মেয়ের বয়সী এক মেয়ে সহ গ্রেফতার হয়েছে রহিমুদ্দীনের ৪৭ বছর বয়সী বাপও। তোমাদেরতো এসব ভয় নেই। কে ছোঁয় তোমাদের টিকি! সুতরাং সব বয়সী জমিনে বীরদর্পে চালিয়ে যাও চাষাবাদ,বুনে যাও বীজ—হাইব্রিড কিন্তু প্রজনন ক্ষমতাবিহীন। একে কি জীবন বলে ? একে কি জীবন বলা যায় ? কোন সে ফাঁসির মঞ্চে আমাকে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছ তোমরা ? প্লিজ ,আর দেরি নয় । পথটা দেখিয়ে দাও। আমি’ই মাথা পেতে দেই তোমাদের সাজানো গিলোটিনে । নিস্তব্দ হয়ে যাক এক যুবকের একাকী প্রতিবাদ।

মগজ বিক্রির হাটে—–
আজ ক্লাস হবে না । কাল হতেও পারে, কিংবা না । তবে আজ প্রাইভেট পড়ানো হবে । কাল ও কিংবা পড়শুও। স্যারের ভাড়া করা সাজানো পড়ার রুমে। অনেকগুলি টুল ,বড় দু’তিনটে টেবিল।টেবিলে কত কি লেখা- ‘শাওন,তোমার জন্য মরতে পারি——-’ ‘দেবু তুই ঘাস ফড়িং চিনিস না ,চিনবি ও না কোনদিন’ “টেবিলে লেখা ভালো না /উচিত নয়” ‘এ্যাই তোরে পন্ডিতি করতে বলছে কে”-নানা সংলাপ, নানা নাটকীয়তা ।আমরাও অপেক্ষায় থাকি ।ক্লাস শুরুর আগে অথবা স্কুল ছুটির পরে । স্যারের ইচ্ছামত । স্যার আসেন ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারায়,মুখে তার অসুখী দাম্পত্য কিংবা ব্যক্তিগত বিষাদের ছাপচিত্র ।পড়ানো শুরু করেন স্যার, নাকি গল্প? কত গল্প জমা স্যারের স্যাঁতস্যাঁতে লোভী মগজে ।বাংলা সিনেমা থেকে শুরু করে বুশ Ñ ক্লিনটন Ñ ঐশ্বরিয়া ।হাসিতে হাসিতে নানা ভঙ্গিমায় বলেন স্যার ।এমনকি অন্য স্যারদের সম্পকে রসালো কিচ্ছা বানিয়ে বলেন স্যার ,‘কোন স্যার কখন কোন ছাত্রীর দিকে ——।’ ক্লাশে গম্ভীর স্যার বাসায় কতো প্রাণবন্ত,আন্তরিক ।আমরাও গল্প ভালবাসি । ভালোবাসি স্যারদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের পেছনের গল্প। হাসতে থাকি স্যারের আবেগী গল্প বলায়। সময় যায়, স্যার অংক করতে বলেন। আমরা করি -২/৩/৫টি। অথবা গ্রামার।স্যার অংক অথবা গ্রামারের নিয়ম বলেন । কি বলেন আমাদের ছোট্ট ছোট্ট মাথায় ঢুকে না। মাথায় তখন গল্প আর গল্পের চরিত্রগুলি ঘুরপাক খায়। এভাবেই কেটে যায় ঘন্টা- সোয়া এক ঘন্টা ।বাইরের দরজায় তখন অন্য আরেকটি ব্যাচের ছেলে মেয়েদের ঘুরঘুর। স্যার ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকায়। আমরাও ব্যাগ খাতা গোছাই। তখনি স্যার বলে আজ তবে এটুকুই থাক——-,পরবর্তী দিনের সিডিউল জেনে আমরা পথে নামি, বাড়ি ফেরার। হাসি ঠাট্টায় মেতে ,রাস্তা উজাড় করে ,কলরবে, বাড়ি ফিরি । তখন ও চলতে থাকে স্যার নামক ‘মুদি দোকানীর’পসরা বিক্রির মহড়া। স্যারদের নিউরণে দিনে দিনে ঘুণপোকা জমে । মগজগুলো দিনে দিনে মাটি হতে থাকে । কেউ টের পায়না । কিন্তু স্যার পায় ,স্যারেরা পায়। নিজের ভেতরের ক্ষরণ থেকে ,পচন থেকে কেইবা নিজেকে বাঁচাতে পারে ?

জনপদে চলছে ত্রাসের আগুন—
ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরিওয়ালারা আসে আমাদের শহরে,এই জনপদে। শুরুটা কখন কে জানে? তবে সেই জলপাইরঙ দশকে নানা বর্ণের ,নানা গোত্রের ফেরিওয়ালায় ছেয়ে যায় আমাদের সবুজ জমিন ।ন্যাড়া হতে থাকে বৃক্ষশোভিত সবুজ পাহাড়। স্বচ্ছ হ্রদের পানি ঘোলা হতে থাকে । ঘোলা হতে থাকে স্থানীয় রাজনীতি ।পাহাড়ী- বাঙালীর চিরকালীন সম্পর্কেও জমা হতে থাকে ধূলোর আস্তর । অভিমান জন্ম দেয় ক্ষোভের ,উদ্বেগের ,রক্তপাতের । জুম পাহাড়ে শুরু হয় লাশের মহড়া । ভিন্নভাষী,ভিন্নঅঞ্চলের ফেরিওয়ালারা ফুলে ফেঁপেঁ কলাগাছ। এ মাটির প্রতি ন্যূনতম হৃদ্যতা ,মুগ্ধতা,ভালোবাসাহীন এইসব ‘বনডাকাত’ ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ’ প্রতিনিধিরা নেতৃত্ব দিতে থাকে জনপদের মাটি আর মানুষের । লজ্জায়,ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেই আমরা কেউ কেউ। অভিমানে দূরে সরে যাই। মিছিলের শ্লোগান ভূলে খুঁজে নেই নিজস্ব নির্জনতা । মাছ- গাছ আর বাঁশের ফেরিওয়ালাদের শহরে আমরাই হয়ে পড়ি অচেনা আগন্তুক ,অপরাধী নাগরিক । পুঁজির পসরা জমিয়ে দিনে দিনে কেটে পড়ে ফেরিওয়ালারা, একে- একে। আমাদের নিঃস্ব- রিক্ত জনপদে আবার নতুন সম্ভাবনার সূর্য উদয়ের অপেক্ষায় থাকি আমি,আমরা । যে যার নিজস্ব ভুবনে খুঁজি সোনালী ডানার স্বপ্ন।প্রতীক্ষায় থাকি-আসবে আগামী দিনের একটি সুন্দর ভোর, চন্দমল্লিকা অথবা হাস্নাহেনার সুঘ্রাণ মুগ্ধ ভোর… একটি সুন্দর সকাল, যে সকালে ফেরিওয়ালাদের নগ্ন মুখ দর্শন করতে হবে না। এ শহরের ছেলেই স্বচ্ছ হ্রদের জল ঢেলে দেবে ফিসারী সংলগ্ন বাধে বন বিভাগের লাগানো নিম গাছের চারায় । ভালোবাসায়—— হৃদ্যতায়।

আমাদের ছেলেরা সব মেয়ে হয়ে গেল,মেয়েরা রমণী
আমাদের সময়গুলি নষ্ট হয়ে গেল,ধরতে পারিনি—–
এরপর আর কোন কথা থাকেনা,থাকতে পারেনা আমাদের। আমরা যে যার মত করেই মেনে নেই ,বেছে নেই নিজস্ব সত্তা। নিজস্ব মানুষের সাথে গার্হস্থ্য জীবন শুরু করার প্রস্তুতিও নেই যে যার নিজস্ব নিয়মে। তবু পেছনের গল্পরা ফিরে আসে বারবার। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেই ঝড়ো হাওয়ার মতো আমাকে এলোমেলো করে দেয় তোমার স্মৃতি। কিছুটা কষ্ট আর কিছুটা বিরহ নিয়ে আমিও হয়ে উঠি তোমার অচেনা আমি। ভেতরে শুকিয়ে খাক হতে থাকে আমার এককালের উড়াল দেয়া মন। স্বার্থপরের মত আমিও চিনে যাই আমার নিজস্ব পথ। যে তোমাকে নিয়ে পথ হাঁটবার দৃঢ় প্রত্যয় ছিলো একদিন, সেই তোমাকে ফেলে কী নির্দ্বিধায় আমি গড়ে তুলি আপন ঘর,আপন বসতি। কেউ জানেনা ভেতরে কী বিষের ক্ষরণ আমার। কিভাবে দগ্ধ হয়ে মাংসপিন্ডে পরিণত হয়ে গেছে, এককালের বাউলিয়ানা হৃদয়। হৃদয় পোড়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আমাদের বসবাসের জনপদেও, সে গন্ধ সহৃদয়বানরা কিংবা সহানুভূতিশীল কেউ কেউ পায়,বাকীরা পায়না,এমনকি তুমিও পাওনা সেই অসহ্য কটু মনবিদীর্ণকারী ঘ্রাণ। পাষাণের পাথর কী হিংস্রতায় চেপে আছে আজো বুকের জমিনে। এ পাথর সরাবে কে, আর কবে ? তুমিও কি কম বদলেছ বিগত ১৮০ দিনে ? যে তুমি আমাকে খুলে দিয়েছিলে হৃদয়ের দ্বার একদিন,বিশ্বস্ততায়,ভালোবাসায়, হঠাৎ যেদিন বুঝতে পারি সে দ্বার বন্ধ এখন-আমার জন্য,তখন বড্ড দেরী হয়ে গেছে। ততদিনে হৃদয়ে জমে গেছে অজস্র ধার-দেনার ইতিহাস। অথচ কী আশ্চর্য, হৃদয়ের দরজা রুদ্ধ করে ভেতরে তৈরি করতে থাকো তুমি তোমার নিজস্ব জীবন,নিজস্ব মানুষের সাথে। পাছে স্বার্থপরতা আর ঈর্ষাকাতরতার অভিযোগ তোল- এই ভয়ে আমিও সরে যেতে থাকি,পালিয়ে বেড়াতে থাকি তোমার জীবন থেকে। আমাদের নষ্ট সময়ে তোমাকে দেয়া সকল প্রতিশ্র“তিই আমি মেনে চলি একা একা,কাউকেই না জানিয়ে। প্রতিশ্র“তি ভঙ্গের কোন বেদনা তাই আমাকে ছোঁয়না,ছোঁবেনা কোনদিন,তোমাকেই কেবল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে আজীবন, শতরূপে—- শতবার।

Check Also

ছুঁয়েছো মেঘ তুমি,ছোঁওনি বৃষ্টি…

এরপর তোমার সাথে আর কোন কথা থাকেনা। আমি আমার নিজস্বতার শব্দ বুনে বুনে একা একা …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + ten =