আমিও বৃষ্টির মতো ফিরেছি বহুবার

‘বৃষ্টি যেরকম আসতে আসতে ফিরে যায়
তেমনি বৃষ্টির মত আমিও ফিরেছি বহুবার’

আর পারিনা আমি । আমার ভেতরের আমিটি ক্রমশঃ মরা নদী। প্রমত্ত পদ্মা যেমন দিনে দিনে শুষ্কতা উষ্ণতার ভাগাঢ় ,আমিও তেমনি—। চারিদিকে এতো হতাশা ,এত বেদনা,ভালো থাকা হয়না আমার। আমিও অসুস্থ মানুষের মত নীল যন্ত্রণায় আশ্রয় নেই গৃহস্থ বিছানায়। আমার চারিদিকে ভীড় করে থাকা নাগরিক জোনাকীরা জ্বলে আর নিভে ,কেউবা জেগেই থাকে অনন্তকাল । আমাকে ছুঁয়ে যায়না প্রতিবেশী জোনাকীরা। তবু বহুকাল আগে ‘পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু’র কালে যে পার্শ¦বর্তিনী জোনাকী প্রথম জ্বেলেছিলো দীপাবলী আমার জীবনে ,সে ডাহুকীও আজ দূর বাঁশবনে বুনে নিজস্ব সংসার ।না,নিঃসঙ্গ নয় ,পাশে আছে অকবি ডাহুক,অলস— অথর—। কবিতা বোঝেনা, গানও। আমার আগুনে পুড়ে পুড়ে আমি ক্রমশঃ হয়ে উঠি নিজস্ব মানুষ। মিথ্যে অঙ্গীকার করে আমার জীবনে আসা ভুল মানবীরা ভুল করে যেতেই থাকে —যেতেই থাকে। কেউ ভুল শুধরায় না তাদের,কেউ পরামর্শ দেয়না ,দেখায় না প্রকৃত পথ । এভাবে জীবনের কাছে পরাজিত হয় আরেকটা জীবন। এক জীবনের কাছে ক্রীতদাস হয়ে যায় অন্য জীবন,ভুল ভালোবাসায়। তবু জীবনের গান গেয়ে যায় জীবনমুখী প্রেমিকের দল। যন্ত্রণার দীপাবলী জ্বেলে বুকের নিজস্ব গহীন প্রদেশে। নিজস্ব অভিমান নিয়ে,ভুলে প্রথম জীবনের কোন রক্তিম বিকেলের প্রথম অঙ্গীকার। সেই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যাবর্তী সময়,দুরের তারে বৃষ্টিস্নান করছিল কালো কাক ,বিলাসে অথবা বেদনায় । তবু ঝড় আসে ,বর্ষণও। হৃদ্যতার সীমানা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় প্রতিবেশী প্রজাপতির দল।বিকেলে কিংবা ভর দুপুরে বাড়ীর সামনের রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া ফ্রক পড়া প্রজাপতিরা কি জানে ,এই বাড়িতে এক দুঃখবিলাসী কবির বসবাসের মানে? কোন সে অভিমানে, কবিতার খাতা ফেলে আত্মহত্যার গল্প লিখে চলে মফস্বলের কবি। কোন অভিমান বুকে বয়ে দিনে দিনে নিজেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে অন্য এক পৃথিবীতে গমনের প্রতিক্ষার প্রহর গুনে চন্দ্রাহত অভিলাষী বোকা কবিয়াল।

‘তুমি একদিন আমার জন্য কেঁদেছিলে ,আমি তাই
বর্ষণ দেখেই বুঝি মেঘের রহস্য ভালেবাসা। আমি
তাই বর্ষন রাত্রির মেঘের শব্দের দিকে আজো
কান পেতে থাকি ,যদি এই সিক্ত ক্লান্ত বর্ষনের মর্ম ভেদ করে
তুমি আরো একবার কেঁদে উঠো ’

অশ্রভেজা সেই দিন আজ স্মৃতি,তোমার এবং আমার,আমাদের–। তুমি কেঁদেছিলে সেদিন। ভালোবাসার প্রথম দিনে এভাবে বুঝি সবাই কাঁদে! আবেগে-উচ্ছাসে? স-ব মেয়ে? কী জানি ! পৃথিবীর সুন্দরতম কান্নার জন্মদায়িনী তুমি। কী এক অদ্ভুদ আবেগে তোমার কান্না ছুঁয়েছিলো আমার ললাট,স্পর্শের রেখা অতিক্রম করে আমার চোখেও ঝড়েছিলো শ্রাবণ ধারা, অবিরাম জলের ধারা থামে,আমাদের কান্না থামেনা। সেই প্রথম আমার কান্নার পাঠ শেখা ,ছলছল চোখে। সেই শুরু এরপর বহুকাল– বহুদিন ঝড়েছে টুপটাপ বহু ভোরের শিউলি ,নিশিদিন— নিশিরাতে— নিঃসঙ্গতায়–। থিকথিকে ভিজেছে বালিশ। আমার যেমন,তোমারও কি নয় ? যুগল কান্নায় নির্মিত হয় স্যাঁতস্যাঁতে , স্রোতজ প্রেমের প্রাসাদ। খসে পড়েনা, জ্বলজ্বল করে,শুকতারার মতো আমাদের নিজস্ব আকাশে। শত ব্যস্ততায়,নাগরিক নির্জনতায়,ক্যারিয়ারের দেয়াল টপকানোর প্রতিটি সিঁড়িতে বারবার অনুপ্রেরণা কিংবা ক্ষোভ হিসেবে ভেসে উঠেছে যার মুখ -সে তুমি ,হ্যাঁ তুমিই তো ! সেই তুমি ,যে চিরঋনী করেছ আমায়,চিরটাকাল যার ভালেবাসার কাছে শ্রদ্ধাবনত ছিলাম এই আমি, তোমার ভাষায় বললে ‘তোমার আমি’। আমার জন্য কত উৎকন্ঠা তোমার,আমার অমঙ্গলের আশঙ্কায় নীরবে কেঁপে কেঁপে উঠতে তুমি,কেউ জানতো না বুকের ভেতর কী গভীর আশঙ্কা নিয়ে কলেজে কিংবা প্রাইভেটে যেতে তুমি। কাউকে বুঝতে দিতে না ,তোমার উৎকন্ঠা ,আশঙ্কা। আর আজ? সেই তুমি কত দূরে, দুরদ্বীপবাসিনী,কত অজানা,রহস্যনারী ! তবু মাঝ রাতে যখন বুকের ভেতর অদৃশ্য হাতুড়ীর শব্দ শুনতে পাই তখন বুঝি কেউ হারিয়েছে আমার,কেউ আজ পাশে নেই। এই হিম হিম শীতের রাতে আজো অপেক্ষায় থাকি আগামী দিনের কোন এক সুন্দরতম ভোরের ,আরো একবার কাঁদবে তুমি – লজ্জায় নীল হয়ে,নিজস্ব ভুল ভেঙ্গে । এরপর ফিরে যেও নিজস্ব জীবনে।

‘কেউ জানেনা একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী
গভীর দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়ায়
একেকটি মানুষ নিজের মধ্যে কীভাবে নিজেই মরে যায়’

আমাদের সবার নিজস্ব কিছু দুঃখ আছে,যার যার মত,তার তার নিয়মে। এইসব দুঃখগুলি অন্যের সাথে শেয়ার করা যায়না,বলা হয়না প্রিয়তম বন্ধু অথবা বান্ধবীকে,এমনকি জন্মদায়িনী মাকেও। কেন? কেমনতর দুঃখ তবে তা ? আমার দুঃখ পাঠক আমি আপনাদের বলব না ( এটা আমার নিজস্ব দুঃখ),আপনারা বলবেন কি ? জানি,সবাই বলবেন ‘না’। তাহলে ? এই যে গোপনে ,নিভৃতে মনের নিজস্ব কিনারায় দুঃখের এই নিবিঢ় চাষাবাদ ,কেন ? বুকের গভীরতম প্রদেশে কেন জমিয়ে রাখা এই অমূল্য গুপ্তধন ? হ্যাঁ,এই জন্যই আমরা মানুষ । নিজের নিজস্বতাকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিতে পারিনা অন্যের সত্তায়। নিজস্ব দুঃখ বুনি নিজস্ব নিয়মে ,মাঝে মাঝে ফোঁড়ে ভুল হয় ,এলোমেলো হয় ,তবু তা নিজের ,একান্ত ব্যক্তিগত । কারো ভুল ধরার অধিকার নেই তাতে।সেই গহীন সাম্রাজ্যে আবাস বাঁধতে পারেনা কোন দুঃসাহসী নাবিক। পথই যে চিনেনা। পথই তো পথিককে নিয়ে যায় নিজস্ব গন্তব্যে। তবে? যে কিশোরীটি ফ্রক পড়ে স্কুলে যায় প্রতিদিন মেঠো পথ ধরে তারও নিজস্ব কিছু দুঃখ আছে। কি সেই দুঃখ ? কাউকে বলবে না সে কোনদিন।নিজের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে কাঁদবে,কাঁদাবে,তবুও বাইরের পৃথিবীর কাউকে বুঝতে দিবেনা তার অন্তর্গত ক্ষত আর নীরব বেদনার জার্নাল। এই তো জীবন ! এরই নাম বেঁচে থাকা। জীবন ঘষে ঘষে জীবনের সাথে আমাদের নিরন্তর বেঁচে থাকা,প্রলোভনে- প্ররোচনায় নয়। তবুও যে দিনের পর দিন গার্হস্থ্য জীবন যাপন করে নারী ও পুরুষ হয়ে উঠে নতুন পরিচয়ে স্বামী ও স্ত্রী ,আত্মার আত্মীয়। সব কিছুই শেয়ার করে তারা,দ্বিপাক্ষিকভাবে।সব কিছু বলে দু’জন দু’জনাকে।সব-কিছু—। তবু কথা থেকে যায়,কথা রয়ে যায়। কিছু কি বাকী থাকেনা ,যা বলা হয়না কিংবা বলেনা পরস্পরকে! বলুন তো বুকে হাত দিয়ে এই শহরের দাম্পত্য বিলাসী সকলে—

Check Also

ছুঁয়েছো মেঘ তুমি,ছোঁওনি বৃষ্টি…

এরপর তোমার সাথে আর কোন কথা থাকেনা। আমি আমার নিজস্বতার শব্দ বুনে বুনে একা একা …

One comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 − 11 =