ছবিটি স্কুলে পড়াকালীন সময়ের.......ক্লাশ টেনে স্কুল থেকে কাপ্তাই ওয়াগ্গা চা বাগানে পিকনিকে গিয়ে তোলা....

মেঠো পথ,আমাকে স্কুলে নিয়ে চলো…

ফজলে এলাহী
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট বদ্বীপটার,পার্বত্য যে জনপদটি,সেই জনপদের সবচে প্রাচীন স্কুলটির ছাত্র ছিলাম আমি,আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে ! যেদিন স্কুল ফাইনাল দিয়ে বেরিয়েছি,তারপর কেটে গেছে তিন দশক। অথচ কী আশ্চর্য ঘোরে,এখনো আমি ঘুরপাক খাই সেই ছেলেবেলায়,সেই স্কুলক্যাম্পাসে ! কেনো ? আমার তুমুল কৈশর,আমার প্রথম প্রেম,আমার স্ফূরিত হওয়া মহাকাল,আমার তুমুল বিতার্কিক জীবন, কিশোরগ্যাং হয়ে যাবতীয় সব পাগলামো,অস্থিরতা….সবই হয়ত কম বেশি প্রভাব ফেলেছে এর পেছনে ! কিন্তু সবচে বেশি প্রভাব ফেলেছে দ্যুতিময় সেই সময়। মূলত আমার আমি’র নির্মাণপর্ব তো ছিলো সে সময়টাই,আর সবার যেমন হয়,কমবেশি ! চলুন না, চোখ বন্ধ করে একটু ঘুরে আসি আমার ফেলে আসা ছেলেবেলায়…

যে ঘটনাটি আলো ছড়ালো খুব !
রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাত শাখা যখন খোলা হয়,তখনকার প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী আমি। ক্লাশ এইটে দিবাশাখা থেকে আসা আমি,রুবেল,পিপলুসহ কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা নতুন শিক্ষার্থী। স্বভাবতই বিখ্যাত স্কুলের পড়াশুনার সাথে ধাতস্ব হতে সময় লাগছিলো নতুনদের।ফলে দেখা যেতো,দিবা শাখাতেই ছিলো সবচে মেধাবীরা,প্রাতঃশাখায় ছিলো অপেক্ষাকৃত কম মেধারীরা। যদিও নতুন আসা বারুদ জ¦ালানো তরুণ শিক্ষকরা প্রায় সবাই’ই প্রাত শাখাতেই যোগ দেয়ায় দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে পরিস্থিতি। খুব মনে পড়ে,১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক বৃত্তি পরীক্ষায় আমাদের স্কুল থেকে প্রায় পঁচিশজন বন্ধু বৃত্তি পায়,যার মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া বাকি সবাই দিবা শাখার ! একটা মজার ইতিহাসও মনে করিয়ে দেই,রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রাতঃশাখার বৃত্তি পাওয়া প্রথম শিক্ষার্থী আমিই! বাকিরা সবাই আমাদের দিবা শাখার আলো ছড়ানো বিখ্যাত সব বন্ধুরা। খুব মনে পড়ে বৃত্তির রেজাল্টের পরদিন,অ্যাসেম্বলিতে যখন আমাকে সবার সামনে দাঁড় করানো হয়,প্রাত শাখার সব শিক্ষার্থীর সম্মিলিত হাততালি,উদযাপন আর উচ্ছাস যেনো এখনো কানে বাজে। কারণ পুরো শাখার কয়েকশত শিক্ষার্থীর সম্মান রাখায় কী যে খুশি ঝকমক করছিলো আমাদের পুরো প্রাত শাখার ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে শুরু করে দশম শ্রেণীর সব ছাত্রছাত্রী আর স্যারদের চোখেমুখে। আরো একটি কারণে এই সাফল্যটি সেদিন অসাধারণ লাগছিলো,কারণ এসেম্বলিতে দাঁড়ানো এক লাজুক কিশোরী সহপাঠির গর্বের হাসিটা আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিলো,যে মুগ্ধতার রেশ কাটাতে সময়ও লেগেছিলো বহুবছর ! ফলে এই ছোট্ট অর্জনটিকে আমি আমার জীবনের সবচে বড় অর্জন বলেই মনে করি এখনো। ক্লাস ফাইভে তিনটিলা স্কুল থেকে পাওয়া বৃত্তির চেয়ে আমার চোখে তাই অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তিটাই বেশি গর্বের। ক্লাস এইটে নিজের শাখা থেকে একমাত্র বৃত্তি পাওয়ার পর সঙ্গত কারণেই স্কুলেও গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিলো আমার।

বিজ্ঞান নয়,মানবিকেই খুঁজেছি মুক্তি !
ক্লাস এইট থেকে ক্লাসের ফাস্ট হয়েই নাইনে উঠলাম। স্বাভাবিকভাবেই তখন মেধারী বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হত,কিন্তু বরাবরের উল্টোপথে চলা আমি,ভর্তি হতে গোঁ ধরলাম মানবিকে ! স্যাররা তো অবাক। কতক্ষন আজিজ স্যার বোঝান,কতক্ষন রিটন স্যার,বেলি দি অভিমান করেন,রিক্তা দি বকে দিচ্ছেন খানিক পর পর, বাসায় বাবাও অনেক বোঝালেন,কে শোনে কার কথা ! আমি যে আজন্মের ঘাউড়া ! সবার সব আদেশ উপদেশ উপেক্ষা করে আমি ভর্তি হলাম মানবিকেই ! যদিও আমার বন্ধুরা এর পেছনে অন্য রহস্য আবিষ্কার করে ফেলেছে ততদিনে ! তাদের ধারণা, সেই যে এ্যাসেম্বলির লালমুখো কিশোরী সহপাঠির জন্যই আমি বিজ্ঞান নয়,মানবিকে ভর্তি হয়েছি। যদিও তাদের এই ধারণা মিথ্যে ছিলো। মাধ্যমিকে বাধ্য মেয়ের সাধ্যই ছিলো না,অবাধ্য-বেপরোয়া এক কিশোরকে প্রভাবিত করার,এটা পরে পরে বুঝেছে আমার বন্ধুরাও। যদিও সেই ‘মিথ’ চলমান ছিলো বহুদিনই।

আমার যত কাজ অকাজ !
আগেই বলেছি,আর সবার মত পড়াশুনায় মেতে ছিলাম না আমি কোন কালেই। রাত জেগে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস আমার প্রাইমারি বেলা থেকেই ধাতস্থ,মাধ্যমিকে সেই ঝোঁকটা আরো বাড়ে। পাশাপাশি বিতর্ক,আবৃত্তি আর সাধারন জ্ঞান প্রতিযোগিতায় অনিবার্য বিজয়ী হিসেবে স্কুল পেরিয়ে পুরো জেলা শহরেই রীতিমত তারকা বনে গেছি! দিবা শাখার শৈবাল-মোস্তফা আর আমার সমন্বয়ে আমাদের বিতর্ক টীমের তুখোড় বিতর্ক তখন অন্য স্কুলের বিতার্কিকদের জন্য বেশ অস্বস্থির কারণ ছিলো,আমাদের সাথে বিতর্ক মানেই তাদের নিশ্চিত পরাজয়। পাশাপাশি আমি-হাসান-দীপু আর প্রবালের সাধারন জ্ঞান টীমটিও দারুন করছিলাম ! জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চট্টগ্রামেও গেছি আমরা বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সেখানেও দারুন করেছিলাম আমরা ! পক্ষপাতিত্ব না হলে সেবার বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হতাম আমরাই। কি যে মন খারাপ করে সেদিন রাঙামাটি ফিরেছি সবাই। আবৃত্তি আর উপস্থিত বক্তৃতা তখন নিয়মিতই হতো স্কুলে,সেসবে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হওয়াটা যেনো নিয়ম হয়েই গিয়েছিলো। এর পাশাপাশি স্কুলে পড়াকালিন সময়েই আমরা বন্ধুরা মিলে হাতে লেখা লিটলম্যাগ ‘নবদিগন্ত’ ও ‘সূচনা’ প্রকাশ করি। মূলত: কবিতাপত্র ছিলো এই দুটি। আমাদের নিজেদের লেখা কবিতা সব। স্কুলের দেয়ালিকায় লেখা ও স্যারদের সাথে সম্পাদনা পরিষদে থাকার স্মৃতিও বড়ই মোহ জাগানিয়া ছিলো। স্কুলে সাতসকালে গিয়ে হকি খেলা আর একবার কোন ম্যাচ না খেলেই জেলায় পর্যায়ে হকি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মজার স্মৃতিও আছে আমাদের।

বোহেমিয়ান মন ছিলো সেই কৈশরেও
স্কুলজীবনে স্কুল থেকেই আমি ও আমার বন্ধুদের উদ্যোগে দুইবার স্কুল পিকনিক করেছি আমরা নিজেদের উদ্যোগে। প্রথমবার ক্লাস নাইনে চট্টগ্রামের ফয়েজলেকে এবং দ্বিতীয়বার দশম শ্রেণীতে কাপ্তাইয়ে। সেই বয়সেই বন্ধুরা ও জুনিয়র সহপাঠিদের নিয়ে বনভোজন আয়োজনের সেই স্মৃতি এখনো মনে পড়লে আশ্চর্য এক ভালোলাগা কাজ করে। মনে আছে,ইয়াসিকা ক্যামেরায় বন্ধুরা চাঁদা তুলে রিল কিনে ছবি তুলতে হতো,নিজেরা কে কয়টি সিঙেল আর কয়টি গ্রুপ ছবি তুলব,সেই হিসাব করতাম কাঁটায় কাঁটায়। ওয়া¹া চা বাগানে এবং কর্ণফুলি কলেজ মাঠে বেশ কয়েকটি ছবি তুলেছিলাম সেবার। তবে ফয়েজলেকে তোলা ছবিগুলো বন্ধু টিপুর ক্যামেরায় তোলার পর কি যেনো এক সমস্যায় আর হাতে পাইনি। কাপ্তাইয়ের ছবিগুলো এখনো আছে আমার কাছে। স্কুলে পড়াকালিন এইসব পিকনিকের পাশাপাশি আরেকটি মজার কাজ করতাম আমরা। প্রতি সন্ধ্যায় তবলছড়ি বিএডিসি পার্কের ওখানে পরিত্যক্ত এক গাড়ীর উপরে বসে দলবেঁধে গান গাইতাম,স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমাদের একটা ব্যান্ড হবে ‘দলছুট্’ নামে ! এ দলে ছিলো পিন্টু,জুয়েল,দীপু,পিপলু,নাজিম,মামুন।

আমাদের নিষ্ফলা মাঠের কৃষকেরা…
ক্লাস এইটে পড়াকালিন স্কুলে একদল নতুন শিক্ষক আসেন,সব টগবগে স্মার্ট তরুণ তরুণী। একেকজন চলনে বলনে পুরোদস্তুর নায়ক। পড়ানোর স্টাইল একদম ভিন্ন। যেনো আকাশ থেকে নেমে আসা দেবদূত এরা আমাদের জীবনে। আমাদের প্রাত শাখায় আজিজ স্যার,রিটন স্যার,নাসির স্যার,সিরাজ স্যার,আলফাজ স্যার,শামসুল হক স্যার,বাণীব্রত স্যার,বেলী আপা,সেলিনা আপা,রিক্তা আপা,রহিম স্যার আমাদের পুরো শাখাটাই যেনো বদলে ফেললেন। স্কুলে শুরু হলো নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ,বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ কো কারিকুলাম এক্টিভিটি। একেক স্যারের ক্লাস একেক ধরণের মজা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম আমরা। কত কি যে বলতেন তারা। বইয়ের পড়ার বাইরের এক বিশাল পৃথিবী তারা খুলে দেন আমাদের সামনে। বিকালে প্রাইভেটে যোগ দিলাম আজিজ স্যার আর রিটন স্যারের বাসায়। পড়া আর কই ! পড়ার বাইরের পৃথিবীর পাঠ যেনো নিতে শুরু করি তাদের কাছ থেকে। এই দুই স্যারের রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাবও পড়ে আমার উপর। যা কলেজে উঠে ঠিকই বিকশিত হয়,ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছে। কি যে আদর করতে আমার স্যারেরা আমাকে ! ভালো ছাত্র হওয়া এবং পাশাপাশি বিতর্ক-উপস্থিত বক্তৃতা-আবৃত্তিসহ সহপাঠের সাফল্যই হয়ত স্যারদের এই বাড়তি ভালোবাসায় প্রণোদনা যুগিয়েছে পুরোটা স্কুলবেলা। আমার খুব মনে আছে,স্যারদের সব স্মৃতি,বকুনি,ভালোবাসার উঞ্চতা কিংবা মায়া ! মনে হয়, চিত্রশিল্পী হলে ঠিকই ক্যানভাসে এঁকে দেখাতে পারতাম সবাইকে,স্যারদের সাথে ঘটে যাওয়া আমাদের অসাধারন সব স্মৃতির দৃশ্যাবলী !

স্কুল বাস আনতে রাজধানী যাওয়া,সেই প্রথম ঢাকা ও প্রধানমন্ত্রী দেখা !
রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের যে বাসটি আপনারা এখনো শহরে চলতে দেখেন,সেই বাসটির বয়সও ৩০ পেরিয়েছে। ১৯৯৩ সালে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপহার হিসেবে পাওয়া এই বাসটি আনতে প্রধানশিক্ষক হরিকমল দত্ত স্যার ও আজিজ স্যারের নেতৃত্বে যে ছাত্র প্রতিনিধিদলটি রাজধানী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গণভবনে গিয়েছিলো আমিও সেই দলের একজন। সেই টীমের সবাই আমরা ব্যাচ-৯৪ এর বন্ধু। এই দলে ছিলাম আমি,জুয়েল,সোনাধন,দেবরাজ,রতন ও মিকেল।

সেই স্কুলবাস আনতে যাওয়ার দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে তোলা ছবি………১৯৯৩ সালে !!

সেই প্রথম আমার ঢাকায় যাওয়া,তাও আবার খোদ প্রধানমন্ত্রীকে তার অফিসে সামনাসামনি দেখা। সেবার আজিজ স্যার আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী অলি আহমেদের বাসায়ও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই স্কুল বয়সে দেশের সরকার প্রধানকে এত কাছ থেকে দেখা ও তার অফিসে যাওয়া,খুব সহজ কোন ঘটনা ছিলোনা তৎকালে। তবে একটা বিশেষ ঘটনার কারণে সেই ট্যুরটি স্মরণীয় হয়ে আছে,তা হলো, চট্টগ্রামে হরিকমল দত্ত স্যারের মেয়ের বাসায় আমাদের যাত্রাবিরতিকালে আমাদের দুইজন বন্ধুর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি। যদিও কয়েকঘন্টা পর পথ হারিয়ে ফেলা সেই বন্ধুদের পেয়ে যাই আমরা। এখনো শহরে বাসটি দেখলেই সেইসব দিন,সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।

যারা ছিলো আমার ক্লাশের সহপাঠি
আমি বরাবরই স্মৃতিবিভ্রমে ভুগি। খুব বেশি মনে থাকেনা স্মৃতিরা। তবুও ৩০ বছর পর একটু চেষ্টা করে দেখি,ক্লাশ এইট থেকে এসএসসি পর্যন্ত প্রাত: শাখায় আমরা সহপাঠি ছিলাম কারা কারা।

ক্লাস টেনে পড়াকালীন একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তবলছড়ির ফটোপ্লাজা স্টুডিওতে তোলা ছবি, ১৯৯৩ সালে…

ফজলে এলাহী,আব্দুল্লাহ আল মামুন রহিম,জাহেদুল আলম রুবেল,সোনাধন চাকমা,সুভাষ চাকমা, গোলাম সায়েম দীপু,নাজিমউদ্দিন,আহমেদ কহিম,রাশেদুল আলম, পিপলু বড়ুয়া,বিপ্লব তালুকদার,সুমন চৌধুরী,এলভিস খীসা,জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,আব্দুর রশীদ, শাহ আলম, জুয়েল চাকমা,মামুন শাহরিয়ার,রাহাত মাসুম,রোকনউদ্দিন,নাসিরুল আলম,মিটু চাকমা, নুরুদ্দিন শরীফ,পিন্টু বড়ুয়া,রতন কুমার দে,দয়াল বড়ুয়া,নিউটন দাশ,সালাউদ্দিন জুয়েল,স্বরূপ মহাজন,সন্তোষ চাকমা, ইয়ামিন জুয়েল,জাহিদ হাসান,জাকির হোসেন-১,জাকির হোসেন-২, জেবিন আক্তার,রাবেয়া বেগম,হোসনে আরা বেগম,গিতালী চাকমা,ঝিলুয়ারা বেগম,ইশরাত জাহান চৌধুরী লুবনা,লুনা আক্তার,শাহনাজ আক্তার, নতুন চাকমা,এলভিস খীসা,ইখতেয়ার উদ্দিন, টিপু,তানভীর,জাহিদুল করিম সুমন,মামুন শাহরিয়ার,হাফিজউদ্দিন, আবু হেনা মাসুম,সিরাজুল বাহার ফরাজি,অপরাজিতা বড়ুয়া,সত্যব্রত চাকমা,সুমন সেন গুপ্ত,নিউটন দাস,ফয়সাল আহমেদ,আব্দুল করিম,ছোটন দে….। সময়ের ধূলোর চাপায় কিছু নাম হয়ত ধূসর এখন…….কিন্তু কোন কোন মধ্যরাতে ঠিকই মনে পড়ে এইসব নাম,অজস্র স্মৃতি….বুকের পলেস্তারা খসে পড়লেই টের পাই,কোথাও কেউ একজন ছিলো,হয়ত দূর শূণ্যপুরে হারিয়ে গেছে,চিরতরে ! কে কোথায় আছে,কে জানে ! আমাদের প্রাত: শাখার বন্ধুদের পাশাপাশি দিবাশাখার বন্ধুদের সাথেও ছিলো হার্দিক সম্পর্ক। হৃদয়ছোঁয়া সেই বন্ধুদের অনেকের নামই মনে আছে,কিন্তু এত নাম লেখার জায়গা কই ! দিবা শাখায় বিজ্ঞান আর মানবিক বিভাগ মিলে প্রায় দুই শতের কাছাকাছি বন্ধু ছিলো আমাদের। যাদের প্রায় অর্ধেকের সাথেই এখনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক,বরাবরের মতই।

ব্যাচ-৯৪ : আমাদের ফের শেকড়ে ফেরা
এটা সত্যি যে, ১৯৯৪ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর আমরা যারা রাঙামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছি,তারা ছাড়া বাকিদের সাথে আমাদের বেশ দূরত্বই তৈরি হয়ে যায়। সেইসময় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গমতার কারণে যারা রাঙামাটির বাইরে চলে গেছে তাদের সাথে আমাদের আর স্বাভাবিক যোগাযোগ তৈরি হয়নি কিংবা একবারেই হারিয়ে যাই অনেকেই। আবার উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য সারাদেশে সবাই কমবেশি ছড়িয়ে পড়ায় আরো একবার দুরত্ব বেড়ে যায় আমাদের। দিবা ও প্রাত শাখার রাঙামাটির সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় আড়াইশত বন্ধুরাই নয়,যোগাযোগ হারিয়ে ফেলি একই সময়ে শহরের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,শাহ উচ্চ বিদ্যালয়,রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্যান্য স্কুল ও স্কুল পেরিয়ে কলেজে আসা বন্ধুৃদেরও। দেখা গেলো,শুধু জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে রাঙামাটিতে বসবাস করা বন্ধুরাই শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগটি কমবেশি টিকিয়ে রেখেছি ! উৎসব কিংবা আয়োজনে,মিলিত হতাম সবাই। কিন্তু বড় যে সার্কেলটি সেটি মোটামুটি বিচ্ছিন্নই হয়ে যায় আমাদের। আমাদের বন্ধু জসীম অন্তত ১২ বছর আগে একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলে বন্ধুদের একটা ছায়ায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০১৬ সালে প্রথমবার যখন আমরা একটি পুনর্মিলনী আয়োজনের উদ্যোগ নিই,তখনই একে একে যেনো ঝাঁপি থেকে বের হওয়া শুরু হলো বন্ধুদের। এই আয়োজন করতে গিয়ে আমরা দেখলাম,খুব কাছেই কোন বন্ধু নিভৃতে পড়েছিলো যোগাযোগহীনতায় ! আবার বহুবছর ধরে একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বেশ কয়েকজন বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া হলো। শুধু কি খুঁজে পাওয়া ! এ যেনো এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ফের। যেনো আবারো কৈশরে ফিরে যাওয়া। যেনো আবারো স্কুলের মাঠেই পিটি করতে একত্রিত হচ্ছি সবাই। ২০১৬ থেকে প্রায় নিয়মিতই নানা আয়োজনে মিলেছি আমরা। আমাদের মধ্যে সম্পর্ক,যোগাযোগ,বন্ধন এত বেশি বেড়েছে যে,মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার স্কুলেই ফিরে গেছি কিংবা কলেজের দিনগুলোতে। প্রতিটি প্রোগ্রাম আয়োজন করতে গিয়েই আমরা নতুন নতুন বন্ধুদের পেয়েছি ! যেনো আরব্য রজনীর জাদুর বাক্স ফুঁড়ে বের হয়ে আসছে একেকজন ! কি যে উচ্ছাস আর আনন্দ আমাদের,পুরনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া,যেনো কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার !

এভাবেই ধীরলয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলা ব্যাচ-৯৪ রাঙামাটি এখন শুধু রাঙামাটিতেই নয়,পুরো দেশের ব্যাচভিত্তিক সংগঠনগুলোর কাছে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। আমরা এভাবেই যূথবদ্ধতায় বেঁচে থাকতে চাই আরো অজ¯্র বছর। হাতে হাত রেখে,কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে…..জয়তু ব্যাচ-৯৪ রাঙামাটি।

(এই লেখাটির সাথে কিছু ছবি এবং চিঠি স্ক্যান করে দেয়া হয়ত যেতো,খুবই জীবন্ত মনে হতো স্মৃতিচারণ, দিবোও ভেবেছিলাম,পরে সিদ্ধান্ত বদলালাম,নানাবিধ কারণে। কারণ কিছু ছবি,কিছু চিঠি এবং কিছু স্মৃতি একান্তই নিজের,ভীষণ ব্যক্তিগত…….হয়ত স্মৃতির জাবর কাটার জন্য অসাধারন, কিন্তুকারো কারো দৃশ্যত স্বাভাবিক জীবনকে এলোমেলো করে দেয়ার জন্যও যথেষ্ট, । তাই একটু পিছুটান নিলাম,বলা যায় ক্ষমাই করে দিলাম হয়ত ! কেউ কেউ না হয় জীবনের দূর অতীতে ফেলা ফেলে আসা মেয়েবেলা-ছেলেবেলা’কে বুকে আঁকড়ে ধরে কাঁদুক,ভিজলই না হয় বালিশ কিংবা শার্টের আস্তিন কোন কোন মধ্যরাতে, আমার কীইবা এসে যায় তাতে ! বেলা শেষে অন্তত শেকড়ে ফিরুক সব পাখি-নদী কিংবা জিপসী জীবন…)

 

নোট : লেখাটি ‘ব্যাচ-৯৪ রাঙামাটি’র ‘ত্রিশে-৯৪’ উৎসব উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ‘স্বপ্নবাজ’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে

Check Also

ছুঁয়েছো মেঘ তুমি,ছোঁওনি বৃষ্টি…

এরপর তোমার সাথে আর কোন কথা থাকেনা। আমি আমার নিজস্বতার শব্দ বুনে বুনে একা একা …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − two =